স্বপ্নের যাদুঘরঃ জয়সলমীর ওয়ার মিউজিয়াম

Jaisalmer War Museum:

“ ঢিকিচ্যাঁওওওও…| ঠাঁই ঠাঁই|”শব্দ করতে গিয়ে সারামুখ থুতুতে ভর্তি| বাড়ির মেঝেতে ছড়িয়ে আছে নানা ধরণের বন্দুক ও পিস্তল ; দেওয়ালে পেন্সিল আর প্যাস্টেল দিয়ে  আঁকা মরুভূমি,বাঙ্ক ও ট্যাঙ্ক| গত কয়েক বছর আগেও এই ছিল আমার ছেলের রোজকার খেলা| লোঙ্গেওয়ালা যুদ্ধের বীর জওয়ান লেফটেন্যান্ট ধরমবীর ভানকে বাড়ির ড্রয়িংরুমে দেখতে দেখতে ভুলেই গেছিলাম আসল যুদ্ধক্ষেত্র ছিল জয়সলমীর আর পাকিস্তানের প্রান্তসীমা| তাই জয়সলমীরের যুদ্ধ যাদুঘর আমার ছেলের কাছে সত্যিই যাদুর ঘর, স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার অনন্য এক সুযোগ|

20161226_123532_marked.jpg

মূলতঃ ১৯৬৫ র ভারত-পাক যুদ্ধ এবং ১৯৭১ এর লোঙ্গেওয়ালা যুদ্ধ র স্মৃতিতেই এই মিউজিয়াম তৈরি | লেফটেন্যান্ট জেনারেল ববি ম্যাথুর পরিকল্পনায় Indian Army র বীরত্ব ও আত্মত্যাগকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ১৯৬৫ র যুদ্ধের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে এই মিউজিয়াম ২০১৫ র আগষ্ট মাসে জনসাধারনের জন্য উন্মুক্ত করে দেন লেফটেন্যান্ট অজয় সিং|

Indian Army র ঐতিহ্যমন্ডিত ইতিহাসকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো এখানে| সুবিশাল সবুজ প্রান্তরের বুকে গড়ে ওঠা এই মিউজিয়ামটিকে বাইরে থেকে দেখলেই ভীষণ গর্ব বোধ হয়|

Souvenir Shop

প্রথমেই আছে Souvenir Shop. এখানে মনোগ্রাম করা T-Shirt, coffee mug , ও অন্যান্য ঘর সাজাবার জিনিস ইত্যাদি পাওয়া যায়|

এখানে ক্যাফেটরিয়াতে কিছু খেয়ে নিতেও পারেন|

এরপর আছে একটি Audio Visual Hall . এখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন যুদ্ধ অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি ডকুমেন্টরি ফিল্ম দেখানো হয়| যা দেখতে দেখতে আমাদের প্রতিবেশি দেশ পাকিস্তান আর চীন সম্পর্কে তীক্ততা যেমন বাড়বে, তেমন ভারত সম্পর্কে গর্ব আরো দৃঢ় ভিত্তিতে আবার নতুন করে গড়ে উঠবে|

এরপর আছে দুটি দর্শনীয় হল— Indian Army Hall এবং Laungewala Hall.

Indian Army Hall

 

IMG_5386_marked.jpg
বাঙ্কারের পাশে ঃ Indian Army Hall

 

এখানে ১৯৪৭ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন লড়াই  এর স্মারকগুলো সংরক্ষিত আছে| বিজেতা দেশ এর ব্যবহৃত অস্ত্র, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেনাবাহিনীর অবদান এখানে পরম যত্নে রাখা আছে|

৩২০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ থেকে কি কি ভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্রমবিবর্তন  হয়েছে তা ভীষণ সুন্দর ভাবে এখানে বর্ণিত আছে|

IMG_5382_marked.jpg
ভারতীয় সেনার ক্রমবিবর্তন

 

  • The Ancient Beginning (320 BC -1600AD)

প্রাচীন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঐতিহ্য গৌরবময়| মৌর্য, গুপ্ত, নন্দ বংশ থেকে শুরু করে রাজপুত, চোল, মারাঠা বাহিনীর উজ্জ্বল শৌর্য পেরিয়ে মোঘল যুগ পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনী বিচিত্রভাবে ক্রমউন্নতি করেছে|

  • The Presidency Army (1600-1857)

ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে ভারতবর্ষকে তিনটি প্রেসিডেন্সিতে ভাগ করা হয়েছিল—কোলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাই| প্রতিটি প্রেসিডেন্সির আলাদা সেনাদল গঠন করা হয়েছিল| সম্ভবতঃ প্রেসিডেন্সি সেনাদলই প্রথম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সর্বভারতীয় সেনাদল|

IMG_5369_marked.jpg
লাল পল্টন

 

এরপর ১৭৫৭ সালে রবার্ট ক্লাইভ সেনাবাহিনীর পুনর্বিন্যাস করেন ও ব্রিটিশ সেনার অনুকরণে সেনাদের লাল কোর্ট পরান—-এদের নাম হয় “লাল পল্টন” |

  • British Indian Army (1857-1897)

১৮৫৭ র বিদ্রোহের পরে মহারাণি ভিক্টোরিয়া ভারতের শাসনভার ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে নেওয়ার পরে এই বাহিনীর নামকরণ করা হয়—British Indian Army. এই বাহিনী এর পর আফ্রিকা, চীন , বার্মা ও আফগান যুদ্ধে একের পর এক জয়  এনে দেয় মহারানীকে|

১৮৯৫ সালে সেনাবাহিনীকে পাঞ্জাব, বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বাই বাহিনী নামকরণ করে বিভক্ত করা হয়|

  • First Reorganisation of the Indian Army in 1903 in the First World War (1900-1918)

১৯০২ সালে Lord Kitchener ভারতীয় সেনাবাহিনীর  Commander-in-chief হয়ে আসেন এবং মাদ্রাজ, মারাঠা, রাজপুতানা, বেঙ্গল ইনফ্যান্ট্রি ,জাঠ, গাড়োয়ালি বিভিন্ন নামে সেনাবাহিনীকে পুনরায় সাজান ও পুনঃপ্রতিস্থাপণ করেন|IMG_5375_marked.jpg

  • 1918-1944 Second Reorganisation and Second World War

IMG_5380_marked.jpg

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কম্যান্ডার-ইন-চীফ রওলিনসন এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী আধুনিক ভারতীয় সেনাবাহিনীর রূপ পায়| এই সময় Panjab, Madras, Grenadiers, Maratha Light Infantry , Rajputana rifles, Gurkhas,Rajput ইত্যাদি নামে অভিজ্ঞতা অনুসারে সেনাবাহিনীকে আধুনিক ভাবে গড়ে তোলা হয়|

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই বাহিনী ব্রিটিশ সরকার এর হয়ে ইতালীর বিরুদ্ধে সোমালিল্যান্ড, এরিট্রিয়া,আবিসিনিয়া এবং উত্তর আফ্রিকাতে বীরত্ব প্রদর্শন করে| গোর্খাবাহিনীর বিশেষ দক্ষতায় জাপান দক্ষিণ এশিয়ার দিকে অগ্রসর হতে বাধা পায়|

  • 1947 onwards –Indian Army marching to the Future

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পাবার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর খোলনলচে বদলে এক বিশাল ,সুদক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও নির্ভীক সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়| ১৯৪৭-৪৮ সালে ইন্দো-পাক,১৯৬২ তে ইন্দো-চীন, ১৯৬৫ তে আবার ইন্দো-পাক, ১৯৭১ এ বাংলাদেশ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা, ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধ —-সব ক্ষেত্রেই ভারতীয় জওয়ানরা তাদের বীরত্ব দিয়ে দেশকে বারবার শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছে|

20161226_121924_marked.jpg
১৯৬২ র ভারত-চীন যুদ্ধে চীনের ব্যবহৃত অস্ত্র

 

এই হলে সাজানো আছে শত্রু পক্ষের কাছ থকে উদ্ধার করা অস্ত্র এবং কিছু উল্লেখযোগ্য ভারতীয় অস্ত্র|20161226_121942_marked.jpg

আছে সিয়াচেন এর মৃত্যুশীতল এলাকায় সেনাদের পরিহিত পোষাক এবং নিউক্লিয়ার ,বায়োলজিক্যাল ,কেমিক্যাল আবহাওয়াতে কাজ করার পোষাক|20161226_121108_marked.jpg20161226_121319_marked.jpg

১৯৬২ ও ১৯৬৫ র যুদ্ধের বিবরণ|

 

20161226_120807_marked.jpg
আমাদের সুরক্ষিত ঘুমের প্রহরী

 

শুধু যুদ্ধ নয় আপদকালীন পরিস্থিতিতেও সেনাদের অবদান এর কথা এখানে বর্ণিত আছে|”country before the self”–এই মন্ত্রে দীক্ষিত ভারতীয় সেনার জীবন|

img_5385_marked

এত আত্মত্যাগ, এত ভালোবাসা, এত সাহসের সাক্ষী হতে হতে চোখ আপনা থেকেই জলে ভরে আসে|

20161226_122717_marked.jpg

Loungewala Hall

20161226_122552

লোঙ্গেওয়ালার যুদ্ধ,১৯৭১… বাংলাদেশের মুক্তি বাহিনীকে সাহায্য করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী| তখন ও পূর্ব পাকিস্তান নামে বাংলাদেশ পশ্চিম পাকিস্তানের অন্তর্গত| ভারতীয় বাহিনীর শক্তিতে ভয় পেয়ে পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট ইয়াইয়া খান প্রমাদ গুনলেন| ভারতকে বেকায়দায় ফেলার জন্য পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ করে দখল করতে চাইলেন ভারতীয় ভূ-খন্ড | এতে পূর্বদিকে সৈন্য সরানোর জন্য ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সুবিধাজনক হবে|

১৯৭১ এর ৪ঠা ডিসেম্বর রাত সাড়ে বারোটায় ২০০০ পাকিস্তানি সেনা লোঙ্গেওয়ালা পোষ্ট আক্রমণ করলো| কিন্তু হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক ভুল ছিল|

১। থর মরুভূমির নরম বালি পাকিস্তানি ট্যাঙ্কের গতি বারবার রূদ্ধ করছিল|

২| মেজর কুলদীপ সিং চাঁদপুরির ভারতীয় সেনারা সংখ্যায় কম হলেও তারা অপেক্ষাকৃত উঁচু বালিয়াড়ি থেকে যুদ্ধ করছিল যা শত্রুপক্ষকে হারাতে সাহায্য করে|

৩| পাকিস্তানি গোয়েন্দাবাহিনীর কাছে খবরই ছিল না যে  ভারতীয় যুদ্ধবিমান কাছাকাছিই আছে|

মাত্র ১২০ জন সেনা নিয়ে একটা গোটা রাত মেজর চাঁদপুরির নির্দেশে লেফটেন্যান্ট ধরমবীর, ক্যাপ্টেন ভৈঁরো সিং, সুবেদার রতন সিং এর মত অফিসারেরা জীবন বিপন্ন করে ভারতের জয় নিশ্চিত করেন| পরদিন সকালে HAL Marut aircraft এর আক্রমণের পর ৩৬ টি পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক, ৫০০ র ও বেশি পাকিস্তানি যুদ্ধযান এবং ২০০ সৈন্য ভারতের মাটিতে বলিদান দিয়ে  পাকিস্তান পিছু হটতে বাধ্য হয় যেমন চিরকাল হয়ে এসেছে|

 

IMG_5397_marked.jpg
HAL Marut Aircraft

 

এই যুদ্ধের খুঁটিনাটি সমস্ত তথ্য দিয়ে সাজানো এই লোঙ্গেওয়ালা হল|

20161226_122804.jpg

106mm M40 RCL gun যা পাকিস্তানি সেনাদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিল

IMG_5393.jpg

106mm M40 RCL gun

 

 

এই হল থেকে বেরিয়ে সমস্ত চত্বর জুড়ে দেখতে পাওয়া যাবে বিজিত  শত্রু পক্ষের যুদ্ধযান, ভারতীয় যুদ্ধযান ইত্যাদি|

 

 

20161226_123444.jpg
ভারত -চীন যুদ্ধের বীর নায়ক

 

জয়সলমীর যুদ্ধ সংগ্রহশালা দেখে বেরিয়ে হাঁটার সময় খেয়াল করলাম আমার উচ্চতা একটু বেড়ে গেছে, মাথাটা উঁচু আর শিরদাঁড়াটা ভারতের জাতীয় পতাকা বহনকারী দন্ডের মত ঋজু—আমার শতকোটি প্রণাম ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যেক বীর জওয়ানকে|

 

IMG_5392.jpg
স্বপ্নের ভারতঃ আমার ভারত

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s